**
আপনার যদি রক্তে প্রিভিলেজ আর যথেষ্ট ব্যাক আপ থাকে তাহলে বিদেশে পড়তে যাওয়া মাত্র ২ মাসের ব্যাপার। কিন্তু অনেকের আছে এই যাত্রা টা একটা পাহাড় ঠেলার সমান। সেই সবকিছু পেরিয়ে ২ বছরের বেশি সময়ের অপেক্ষার পর অবশেষে আমি গত ২৩শে মে ২০২৩ এ পৌছাই,আলহামদুলিল্লাহ।
সম্ভবত ২০২০ এর একদম শেষের দিকে আমার ফ্যামিলি আমাকে বলে আমার বিদেশে পড়তে যেতে হবে। তখন সবেমাত্র এইচ-এস-সি পাশ করেছি। এরপর অনেক ঘাটাঘাটি পর সিদ্ধান্ত নিলাম জার্মানি যাবো। কারন জার্মানির এই টিউশন ফি ছাড়া পড়াশুনাই আমার জন্য একমাত্র সবচেয়ে সুন্দর অপশন।
যেহেতু আমি ব্যাচেলর এ যাবো তাই ২০২১ এর মার্চে ২৫% কমপ্লিট করার জন্য একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে CSE তে ভর্তি হলাম।মূলত এরপর থেকেই শুরু হয় আমার জার্মানিতে ব্যাচেলরে আসার জার্নি। একটু একটু করে খোজ নেয়া শুরু করলাম কিভাবে য়ুনিভারসিটি তে এপ্লাই করতে হয়, প্রসেসিং কি, uni assist কি , Daad. de তে সাবজেক্ট খোজা। কত যে ঘন্টার পর ঘন্টা রাত শুধু website এর পেজ পড়ে শেষ করেছি। গ্রুপ গুলোর ফাইল সেকশন পড়ে পড়ে শেষ করেছি তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।
কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলো এই ওয়েটিং পিরিয়ড। তাই সাহস করে অক্টোবরের ১৯ তারিখ ২০২১ এমবাসি তে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে নেই। এই এপোয়েন্টমেন্ট নেয়ার আগে প্রায় ১-১.৫ মাস আমি আর আমার এক বন্ধু মিলে অংক করতাম কখন এপোয়েন্টমেন্ট নিলে কখন ডক সাবমিশন মেইল পাবো। তাও হিসাব মিলাতে পারি নাই। এম্বাসির ১০ মাসের ওয়েটিং পিরিয়ড দেখে অক্টোবরে নেই যেনো উইন্টার-২২ ধরতে পারি। কিন্তু তা পরে গিয়ে দাড়ালো ১৯ মাসের অপেক্ষায়।
২০২২ এর এপ্রিলে ২৫% শেষ করার পর মে তে IELTS এক্সাম দিয়েই এপ্লাই করা শুরু করলাম। এর মধ্যে আমার বাংলাদেশের যুনিভার্সিটি জানায় ২৫% এর ট্রান্সক্রিপ্ট দিবে না। যেই পেপার দিলো সেই পেপার দিয়ে Uni assist ভিপিডি(VPD) দিলো না। আবার রিকোয়েস্ট করে ট্রান্সক্রিপ্ট নিলাম এপ্লাই করলাম VPD আসলো ১.৮। এরপর আলহামদুলিল্লাহ একে একে THI,Rhine-Waal,THWS আরো কয়েকটা যুনিভার্সিটি থেকে অফার লেটার পাই। কিন্তু সেই যে কি প্যারায় পরছিলাম এইটা কাউকে বুঝানো সম্ভব না, কত যে দুশ্চিন্তা একবার ভেবেছিলাম আমার আর জার্মান যাওয়াই হচ্ছে না। এখনো ভাবলে ভয় লাগে।
অফার লেটার পাওয়ার পরেই শুরু হয় অপেক্ষা আর অপেক্ষা , তখন সময়তো আর কাটে না , এম্বাসিও আমাকে ডক দেয় না। এই ডকের জন্য টুইট ক্যাম্পিং থেকে প্রেস ব্রিফিং কোনো কিছুই বাদ ছিলো না করার।
আমি Technical University of ingolstadt এর Autonomous Vehicle Engineering য়ে এনরোলড ছিলাম। তখন নিয়ম ছিলো ১ম সেমিস্টারের মধ্যে German A1 সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। যদিও এই রুলস এখন নাই। আমার আশা ছিলো ১ম সেমিস্টারের পরীক্ষা জার্মানি এসেই দিতে পারবো কিন্তু এম্বাসি বেধেছে বাধ। আমাকে জানানো হলো ১ম সেমিস্টারের মধ্যে A1 না দিলে এনরোল্ডমেন্ট বাতিল।আর তখন হাতে মাত্র ১.৫ মাস বাকি। আবার কি এক পরিস্থিতি ভাবলাম জার্মানি যাওয়া মনে হয় আর হচ্ছেই না। এরপর আল্লাহর রহমতে ১ মাসের মধ্যে জার্মান -A1 এক্সাম দিয়ে পার পেলাম।
১৩ মার্চ ২০২৩ হঠাৎ করেই এম্বাসির সারপ্রাইজ ডক সাবমিশন মেইল। তখনো ব্লক করি নাই ,২ দিনের মধ্যে ব্লক করে ডক সাবমিট করলাম। ২৭ এপ্রিল ২০২৩ এ ইন্টারভিউ ডেট পেলাম। ইন্টারভিউ এর জন্য বিরাট একটা প্রিপারেশন নিলাম। কিন্তু ইন্টারভিউ আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। ( গ্রুপে ইন্টারভিউ এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করা আছে পড়ে নিতে পারেন)
অবশেষে ইন্টারভিউ দেয়ার ১৮ দিন পর ১৫ মে ২০২৩ ভিসা হাতে পেলাম। হঠাৎ করে ফিল করলাম ১৯ অপেক্ষা আর ২ বছর ধরে জার্মান যাওয়ার অপেক্ষা কিভাবে যেনো শেষ হয়ে গেলো।
২৩ মে ২০২৩ এর এক ভোরে সূর্য উদয় দেখতে দেখতে লক্ষ্য করলাম মাতৃভূমি , মাকে ছেড়ে , সবাইকে ছেড়ে আমি হাজার মাইল দূরে আমি একা , ভীষণ একাকী কোথাও দাড়িয়ে।
জার্মানি এসে মনে হলো এ যেন এক সাগর মাঝে আমি এক ডিঙি নৌকায়। যেই যাত্রার শুরু হলো এই জার্নির সম্ভবত কোনো শেষ নেই কোনো গন্তব্য নেই শুধুই ছুটে চলে আর এগিয়ে যাওয়া। সে গল্প না হয় আরেকদিন বলা যাবে।
পুরো জার্নির শেষে মনে হয়েছে। শুধু ধৈর্য আর চেষ্টা করে যেতে হবে। আর সৃষ্টি কর্তার কাছে দোয়া। একদিন ইনশাল্লাহ সব হয়েই যায়। পথ আমরা পার হয়েই যাই।
এই পুরো জার্নিতে অনেকের কাছে থেকে হেল্প পেয়েছি সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। গ্রুপের এডমিন, মডারেটর দের ধন্যবাদ। আর যেই সব ভাইয়া আপুরা এতো কষ্ট করে ফাইল গুলো তৈরি করে আমাদের পথ সহজ করে দিয়েছেন তাদেরকেও একটা ধন্যবাদ।
©️Abir
0 Comments