ব্যবসা ও অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একাডেমিক জার্নাল চয়েস
আমরা যারা রিসার্চ করি, তাদের সবারই একটা স্বপ্ন থাকে নিজের লেখা একদিন বড় কোনো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হবে, নাম হবে গুগল স্কলার বা রিসার্চগেটে, আর সেই আর্টিকেল একদিন হয়ত আমাদের উচ্চশিক্ষা, ফান্ডিং, ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স বা ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি পজিশন পেতে বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকেই শুরুতে অভিজ্ঞ কাউকে না জিজ্ঞাসা করে বা না বুঝে এমন সব জার্নালে আর্টিকেল সাবমিট করে ফেলি যেগুলো প্রিডেটরি বা ভূয়া জার্নাল নামে পরিচিত। একবার যদি সেই জার্নালে আপনার নাম থেকে যায়, তখন সেটা সিভিতে গর্বের চেয়ে বরং লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমেই আসি ইনডেক্সিং নিয়ে। আজকের দিনে একাডেমিক দুনিয়ায় Scopus ইনডেক্সিং প্রায় এক ধরনের মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেছে। এর চেয়েও বড় মর্যাদার জায়গা হলো Web of Science (SSCI, SCIE, ESCI)। বিশেষ করে ব্যবসা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যদি কোনো জার্নাল SSCI তে থাকে, সেটা অনেকটাই “সোনার হরিণ” পাওয়ার মতো। যাচাই করার জন্য আপনি সহজেই Scopus Preview বা Web of Science Master Journal List ব্যবহার করতে পারেন। আরও স্মার্ট উপায় হলো Chrome বা Edge–এর জন্য Rapid Journal Quality Check এর মতো এক্সটেনশন ব্যবহার করা। আর যদি কোনো নতুন জার্নাল SSCI বা Scopus এ না থাকে, তখন দেখতে হবে প্রকাশক কতটা রেপিউটেড। উদাহরণ হিসেবে Springer, Wiley, Elsevier এর নতুন কোনো জার্নাল হলেও ব্র্যান্ড ভ্যালু আর স্বচ্ছ রিভিউ প্রসেসের কারণে সাধারণত বিশ্বাস করা যায়।
পরের ধাপ হলো Scimago তে যাচাই করা। খুব সহজ: গুগলে জার্নালের নামের সাথে “Scimago” লিখে সার্চ করুন। যদি Scopus এ ইনডেক্সড থাকে, তাহলে সেখান থেকে পাবেন জার্নাল কোন Quartile এ আছে। Q1 মানে টপ ২৫% এবং খুব ভালো মানের জার্নাল, Q2 মানে টপ ৫০% এবং স্ট্যান্ডার্ড মানের, আর Q3 বা Q4 তুলনামূলক নিচে থাকলেও একেবারে খারাপ নয়। ব্যবসা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে Q1/Q2 জার্নালে টার্গেট করা সবসময় ভালো, কারণ এসব জার্নালের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক, সাইটেশন সংখ্যা আর ইমপ্যাক্ট বেশি থাকে, যা আপনার গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
ব্যবসা ও অর্থনীতির জন্য আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ABDC ও ABS লিস্ট। ABDC (Australian Business Deans Council) লিস্টে জার্নালগুলো A*, A, B, C ক্যাটাগরিতে থাকে যেখানে A* সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। অন্যদিকে ABS (Academic Journal Guide, UK)–এ র্যাঙ্কিং হয় 4*, 4, 3, 2, 1 যেখানে 4* আর 4 মানেই টপ লেভেল জার্নাল। আন্তর্জাতিক ফান্ডিং, পিএইচডি, পোস্টডক বা বিজনেস স্কুলের চাকরির ক্ষেত্রে ABDC আর ABS এর র্যাঙ্কিং অনেক গুরুত্ব বহন করে। তাই জার্নাল বাছাইয়ের সময় এই লিস্টগুলোও অবশ্যই দেখবেন।
এরপর আসে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর (IF) এর বিষয়টি, যা প্রায়ই নতুন রিসার্চারদের জন্য বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ভাবেন IF যত বেশি, জার্নাল তত ভালো। কিন্তু আসলে বিষয়টা এত সোজা নয়। কারণ অনেক প্রিডেটরি বা নিম্নমানের জার্নালও কৃত্রিমভাবে খুব বেশি IF দেখাতে পারে যেমন ৭–৮–৯ বা তার চেয়েও বেশি, যাতে রিসার্চারদের আকৃষ্ট করা যায়। বাস্তবে ব্যবসা ও অর্থনীতির শীর্ষস্থানীয় অনেক SSCI বা ABDC/ABS লিস্টেড জার্নালের IF প্রায়ই ২–৫ এর মধ্যে থাকে; কিছু বিশেষায়িত বা অত্যন্ত নামকরা জার্নালের ক্ষেত্রে এটা ৬–১০–এও যেতে পারে, তবে সেটা তুলনামূলক কমন নয়।
যেখানে বিভ্রান্তি হয়, সেটা হলো প্রিডেটরি জার্নালের IF কৃত্রিমভাবে খুব বেশি দেখালেও তাদের ইনডেক্সিং (যেমন SSCI, Scopus) বা Quartile (Q1/Q2) প্রায়ই থাকে না, অথবা প্রকাশক থাকে অজানা বা সন্দেহজনক। তাই কেবল IF দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে জার্নালের ইনডেক্সিং (SSCI বা Scopus আছে কিনা), প্রকাশকের নাম (Elsevier, Wiley, Springer ইত্যাদি), আর Scimago এর Quartile র্যাঙ্ক একসাথে বিবেচনা করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফি। প্রিডেটরি জার্নালগুলোর মূল ব্যবসা লেখকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, তাই সাবধান থাকতে হবে। অথচ স্ট্যান্ডার্ড জার্নালে তিন ধরনের মডেল থাকে: Closed Access (যেখানে লেখক কোনো টাকা দেয় না, রিডার সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে পড়ে), Open Access (যেখানে লেখক প্রায় $800–$5000 ফি দেয় এবং রিডার ফ্রি পড়তে পারে), আর Hybrid (যেখানে লেখক চাইলে ফি দিয়ে ওপেন করতে পারে, না চাইলে ক্লোজড থাকে)। এখন আবার অনেক টপ জার্নাল যেমন Energy Economics, FT50 এর কিছু জার্নাল বা ABDC A/A* বা ABS 4 এ submission fees (৫০–২০০ ডলার/ইউরো) রাখা হয়েছে, যা ওদের ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে এটা লুকানো থাকে না, বরং publishing process cost কভার করার জন্য নেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে কিছু ব্র্যান্ড আছে যেগুলো প্রায় চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায় যেমন Elsevier, Springer, Wiley, Taylor & Francis, Sage, Oxford University Press, Cambridge University Press, MIT Press ইত্যাদি। ব্যবসা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে আবার বিশেষ করে FT50 এ থাকা জার্নালগুলো সবচেয়ে টপ লেভেল, এরপর ABS আর ABDC এর লিস্ট, তারপর SSCI ইনডেক্সড জার্নাল, তারপর Scopus ইনডেক্সড জার্নাল। তবুও সব ক্ষেত্রে ইনডেক্সিং, প্রকাশকের রেপুটেশন আর এডিটরিয়াল বোর্ড খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া জরুরি।
প্র্যাক্টিক্যালভাবে বলতে গেলে শুধু SSCI বা Scopus লিস্ট দেখা বা প্রকাশকের নাম দেখাই যথেষ্ট নয় সাথে সাথে সঠিক জার্নালগুলো চিনতে আপনাকে কিছু সংখ্যাগত ইনডিকেটরও দেখতে হবে, যেমন CiteScore। Scopus এর এই CiteScore জার্নালের সামগ্রিক সাইটেশনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, যা IF এর মতো হলেও আলাদা এবং অনেক সময় ব্যবসা ও অর্থনীতির নতুন বা স্পেশালাইজড জার্নাল চেনার জন্য খুব কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক Innovation and Green Development জার্নালটি, যা পরিবেশ, ইনোভেশন এবং টেকনোলজির ইন্টারফেস নিয়ে কাজ করে; এই জার্নাল Scopus Q1 এ ইনডেক্সড এবং এর CiteScore ক্রমেই ভালো হচ্ছে। এই CiteScore দেখে সহজেই বোঝা যায় যে জার্নালটির আর্টিকেলগুলো বাজার ও একাডেমিয়াতে কতটা সাইটেড হচ্ছে, ফলে এর মান ও ইমপ্যাক্ট স্পষ্ট হয়।
আরেকটি উদাহরণ হলো Research in Globalization যা গ্লোবাল ইকোনমিক ট্রেন্ডস, এফডিআই বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক রিসার্চারদের জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এই জার্নালও Scopus Q1 এ ইনডেক্সড এবং এর CiteScore প্রতি বছর বাড়ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে গবেষণা কমিউনিটিতে এর গ্রহণযোগ্যতা ভালো। একইভাবে Resources Policy নামের জার্নালটি রিসোর্স ইকোনমিক্স, ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা পলিসি রিলেটেড ইস্যুতে যারা কাজ করেন তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এরও CiteScore ও IF দুটোই ভালো, আর SSCI, ABS & ABDC ইনডেক্স থাকার কারণে একাডেমিকভাবে অনেক মর্যাদার।
এইভাবে আপনি যদি CiteScore এর পাশাপাশি SSCI/Scopus ইনডেক্সিং, প্রকাশকের নাম (যেমন Elsevier, Wiley, Springer), এবং Quartile (Q1/Q2) সবকিছু একসাথে যাচাই করেন, তাহলে অনেক নিরাপদ ও ভালো মানের জার্নালে সাবমিট করতে পারবেন। বিশেষ করে বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস রিসার্চের জন্য এই ধরনের উদাহরণগুলো হাতে থাকলে এবং CiteScore বা Quartile দেখতে অভ্যস্ত হলে সহজেই বুঝে যাবেন কোন জার্নাল আসলেই মানসম্পন্ন আর কোনটা এড়িয়ে চলা ভালো।
শুধু নাম বা IF দেখে নয়, বরং SSCI/Scopus ইনডেক্সিং, CiteScore, প্রকাশকের ব্র্যান্ড আর Quartile একসাথে দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নিন। আমার নিজের অভিজ্ঞতায়ও এই পদ্ধতিই বেশি কাজে লেগেছে আর আশা করি আপনার ক্ষেত্রেও কাজে আসবে।
—
মোঃ মুস্তাকিম রশীদ
0 Comments